শিরোনাম

South east bank ad

দুদকে কমিশন না থাকায় কার্যক্রমে স্থবিরতা

 প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০১:২৫ অপরাহ্ন   |   দুদক

দুদকে কমিশন না থাকায় কার্যক্রমে স্থবিরতা


দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সর্বোচ্চ কাঠামো ‘কমিশন’ নেই তাও আড়াই মাস হতে চলল। নতুন মামলা, অনুসন্ধান, অভিযোগপত্র অনুমোদন, আসামিকে বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া, সম্পদ ক্রোকসহ কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত সব কাজই এখন বন্ধ। শুধু চলছে প্রশাসনিক রুটিন কার্যক্রম। এ কারণে দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে একরকম স্থবিরতা নেমে এসেছে। 

বিশ্লেষকরা বলেছেন, ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুদকের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে জনআস্থার সংকট রয়েছে। তবে কমিশন ছাড়া দুদক– এত লম্বা সময় আগে কখনও ছিল না। 

দুর্নীতির বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণের ওপর জোর দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিভিন্ন আলোচনায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাবের বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের পরও দুর্নীতি দমন কমিশন নেতৃত্বহীন, অকার্যকর থাকায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। 

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করার পর দুদক নেতৃত্বশূন্য হয়। এরপর নতুন কমিশন আর গঠন হয়নি। দুদকের ছয়টি অনুবিভাগে দুই হাজারের বেশি অভিযোগ অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকশ অভিযোগের অনুসন্ধান শেষ হয়েছে। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা মামলার সুপারিশ করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়েছেন। কমিশন না থাকায় অভিযোগগুলোর বিপরীতে মামলার অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র অনুমোদনের ক্ষেত্রেও অচলাবস্থা চলছে। 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গত কমিশনের অনুমোদিত অনুসন্ধান, তদন্ত চললেও নেতৃত্বহীন অবস্থায় বিভিন্নভাবে দুর্বলতা ও স্থবিরতায় ভুগছে প্রতিষ্ঠানটি। কমিশন না থাকায় বাস্তবে দুর্নীতি সহায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, নতুন কমিশন গঠনে আইনি বাধ্যবাধকতা যে লঙ্ঘিত হয়েছে, তা সরকারের জন্য বিব্রতকর। কমিশনহীন অবস্থা যত দীর্ঘায়িত হবে, জনমনে প্রশ্ন ততই জোরালো হবে। 

তিনি প্রশ্ন রাখেন, দুদককে অনির্দিষ্টকাল স্থবির করে রাখার মাধ্যমে সরকার কি বাস্তবে কর্তৃত্ববাদের ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি সহায়ক ভূমিকার পথ বেছে নিয়েছে। 
জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি বলেন, দুদকের ‘কমিশন’ গঠনের লক্ষ্যে সার্চ কমিটি গঠনের কাজ শিগগির শুরু হতে পারে। এই মুহূর্তে সার্চ কমিটি করা হলে দুদকের আগের আইনেই কমিশন গঠন করা হবে। দুদক আইন সংশোধনের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে যোগ করেন তিনি।  

দুদক আইন-২০০৪ অনুযায়ী, পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটিতে যারা থাকবেন তারা হলেন– সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সদ্য বিদায়ী সচিব এবং সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান।  

দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম সমকালকে বলেন, কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি কবে হবে– এ ব্যাপারে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। দুদকের কার্যক্রম এখন কীভাবে চলছে– এই প্রশ্নে তিনি বলেন, কমিশন না থাকায় বর্তমানে অভিযোগ গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আগের কমিশনের অনুমোদন দেওয়া অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্ত চলছে। মামলা, অভিযোগপত্রসহ কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত কাজগুলো বন্ধ রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে আমি অতি জরুরি কাজগুলো করছি। নতুন কমিশন যোগ দেওয়ার পর এসব কাজের অনুমোদন দেবে। 

সূত্র জানায়, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দুদক সংস্কার-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের আলোকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে দুদক আইন-২০০৪-এর অধিকতর সংশোধনের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করে গত ২৩ ডিসেম্বর। নতুন সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর সংসদের অধিবেশন শুরু হয় গত ১২ মার্চ। এই দিনেই দুদক-সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়। 

ওই ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে পাস হয় ১১৩টি, বাতিল হয় সাতটি। বাকি ১৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আইন অনুযায়ী, গত ১২ মার্চ অধিবেশনে উত্থাপনের দিন থেকে গত ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ৩০ দিন পার হওয়ার পর ওই ১৩টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে। গত ১১ এপ্রিল থেকেই দুদক আইন-২০০৪ পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল হয়েছে। 

আলোচনায় যারা 
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ব্যক্তির সমন্বয়ে সার্চ কমিটি একাধিক সভা করে দুদকের নতুন তিন কমিশনার নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে ছয় ব্যক্তির নাম পাঠাবে। পরে রাষ্ট্রপতি ছয় থেকে তিনজনকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেবেন। এই তিনজনের মধ্যে একজনকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হবে।

দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনার পদের জন্য কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে আছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা, ঢাকা মহানগর আদালতের সাবেক সিনিয়র স্পেশাল জজ মোতাহার হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর ভাই সাবেক সচিব বাকী বিল্লাহ, সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, ড. সাজ্জাত হোসেন ভূঁইয়া ও সাবেক সচিব এ এইচ এম নুরুল ইসলাম। 

কার্যক্রম স্থবির
কমিশন না থাকায় গত ৩ মার্চের পর থেকে নতুন কোনো মামলা বা অভিযোগপত্রের অনুমোদন হয়নি। পাচারের অর্থ ফেরত আনার লক্ষ্যে কোনো দেশে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকুয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো যায়নি। কোনো আসামিকে বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া যায়নি। আদালতের আদেশ অনুযায়ী আসামির সম্পদ ক্রোক, ফ্রিজ করা হয়নি। জোরদার হয়নি দুদকের গোয়েন্দা অনুসন্ধানও। ফাঁদ পেতে (ট্র্যাপ) ঘুষখোর গ্রেপ্তার ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা করাও সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে শুধু এনফোর্সমেন্ট ইউনিট মাঝে মাঝে দুয়েকটা অভিযান চালাচ্ছে।  

মাঝেমধ্যে গণশুনানির আয়োজন করা হলেও আগের মতো গতি নেই। বিতর্ক প্রতিযোগিতা বন্ধ। নতুন করে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠন বা আগের কমিটি পুনর্গঠন করা যাচ্ছে না। থমকে আছে উচ্চ পদে পরিচালক, মহাপরিচালকদের পদোন্নতি, বদলি। বর্তমানে ১০টি পরিচালক পদ খালি থাকলেও উপপরিচালক থেকে পরিচালক পদে পদোন্নতি দিয়ে ওই সব শূন্য পদ পূরণ করা যাচ্ছে না। বিশেষ প্রয়োজনে ১০ লাখ টাকার বেশি কেনাকাটা করাও সম্ভব হচ্ছে না। 
BBS cable ad

দুদক এর আরও খবর: