স্ত্রী-সন্তানসহ সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দের আদেশ
দুর্নীতির অভিযোগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া, তার স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তার পরিবার ও স্বার্থসংশ্লিষ্টদের নামে থাকা ২২ কোটি ৬৫ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩০ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পৃথক দুটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রবিবার (২৫ জানুয়ারি) ঢাকা মহানগর দায়রা জজ ও সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজ এসব আদেশ দেন।
দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ ও সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ হোসেন এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন—সাবেক ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়ার স্ত্রী আফরোজা জামান, দুই ছেলে আসিফ শাহাদাৎ ও আসিফ মাহদিন, মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা এবং শ্যালক হারিচুর রহমান।
তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আদেশ চেয়ে দুদকের পক্ষে আদালতে আবেদন করেন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. আলিয়াজ হোসেন।
আবেদনে বলা হয়, আছাদুজ্জামান মিয়া, তার পরিবার ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়ের উৎসবহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। অনুসন্ধানকালে জানা যায়, মো. আছাদুজ্জামান মিয়া তার নিজের নামে এবং পরিবারের সদস্য ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেন। এসব অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ হস্তান্তর করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন—এমন তথ্যও বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া গেছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, অভিযুক্তরা বিদেশে পালিয়ে গেলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র ও সম্পদ উদ্ধার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
এছাড়া আদালত আছাদুজ্জামান মিয়াসহ মোট আটজনের নামে থাকা ২২ কোটি ৬৫ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩০ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দেন।
যাদের স্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছে, তারা হলেন—আছাদুজ্জামান মিয়ার স্ত্রী আফরোজা জামান, ছেলে আসিফ শাহাদাৎ ও আসিফ মাহদিন, মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা, শ্যালক হাফিজুর রহমান এবং শ্যালিকা পারভীন সুলতানা ও ফাতেমাতুজ্জোহরা।
জব্দ হওয়া সম্পদের মধ্যে রয়েছে, গুলশানের জোয়ার সাহারায় ১০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ছয়তলা আবাসিক ভবন, ধানমন্ডি ও গুলশানে একটি করে ফ্ল্যাট, পূর্বাচলে জমি, আফতাব নগরে ছয় কাঠা জমি। এ ছাড়া গাজীপুর, ফরিদপুর ও নারায়ণগঞ্জেও তাদের নামে জমি রয়েছে।
আদালত সূত্র জানায়, এসব স্থাবর সম্পদ জব্দ না করা হলে বিচার শেষে রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হবে না, যা রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। পাশাপাশি অভিযুক্তরা দেশত্যাগ করলে অনুসন্ধান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুনানি শেষে আদালত দুদকের উভয় আবেদন মঞ্জুর করেন।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর মহাখালী ফ্লাইওভার এলাকা থেকে আছাদুজ্জামান মিয়াকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
আছাদুজ্জামানের সম্পদের তথ্য নিয়ে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক মানবজমিন, পরে আরও কয়েকটি পত্রিকায় আছাদুজ্জামানের ‘বিপুল সম্পদের’ তথ্য তুলে ধরা হয়।
২০২৪ সালের ১৬ জুন ‘মিয়া সাহেবের যত সম্পদ’ শিরোনামে মানবজমিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাড়ির পর বাড়ি। জমি এবং ফ্ল্যাটের সারি। কী নেই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা আছাদুজ্জামান মিয়ার। রীতিমতো গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। তবে শুধু নিজের নামে নয়। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ের নামেও বিপুল সম্পত্তি গড়েছেন ডিএমপি’র সাবেক এই কমিশনার।"
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বরাত দিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, “পুলিশের সাবেক এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্ত্রীর নামে ঢাকায় একটি বাড়ি ও দুটি ফ্ল্যাট এবং মেয়ের নামে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে ৬৭ শতক জমি রয়েছে। এই তিন জেলায় তার পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে আরও ১৬৬ শতক জমি।”
আছাদুজ্জামান মিয়া ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তাকে জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত সেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেয় সরকার। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়।


