সন্দ্বীপে সাগরের ভাঙনে উন্মুক্ত দুটি সাবমেরিন কেবল, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা
চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ উপকূলের পূর্বে চ্যানেল-সংলগ্ন অংশে সাম্প্রতিক ভাঙনে বিদ্যুৎ সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ ৩৩ কেভি সৈয়দপুর-বাউরিয়া সাবমেরিন কেবলের একাংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। এতে সন্দ্বীপ চ্যানেলের তলদেশে পোতা কেবল দুটি ক্ষতিগ্রস্ত ও চুরির ঝুঁকির পাশাপাশি পুরো দ্বীপে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের প্রথম এ সাবমেরিন কেবল বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইন মেরামতের অভিজ্ঞতা না থাকায় বড় ধরনের ঝুঁকি ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের শঙ্কায় রয়েছে গ্রাহক ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কর্তৃপক্ষ।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাবমেরিন কেবল লাইনের ত্রুটি কিংবা বৈদ্যুতিক কেবল দৃশ্যমান হয়ে গেলে ঝুঁকি এড়াতে করণীয় কী, সে বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা, প্রশিক্ষণ কিংবা কারিগরি দক্ষতার বিনিময় হয়নি। পিডিবির বিতরণ ও প্রকৌশল বিভাগও এ ধরনের সংকট তৈরি হলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা ও প্রস্তুতি নিয়ে রাখেনি। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সাত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর সমুদ্র উপকূলে বৈদ্যুতিক লাইন মাটি ও সমুদ্রকূলে উঠে আসায় সমস্যাটি সমাধানে সংস্থাটির পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) শরণাপন্ন হলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না পিডিবি।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর উপকূল থেকে ১৫ কিলোমিটারের ৩৩ কেভি দুটি কেবল স্থাপনের মাধ্যমে গ্রিড সংযোগ স্থাপন করা হয়। এজন্য সন্দ্বীপে ১৬ ও সীতাকুণ্ডে ১০ কিলোমিটার ওভারহেড লাইন (মাটির ওপর) স্থাপন করা হয়েছে। প্রথম দিকে একটি কেবলের মাধ্যমে ১০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে প্রায় অর্ধলক্ষ গ্রাহক প্রতিদিন চার-পাঁচ মেগাওয়াট ব্যবহার করে। তবে দুটি কেবলের মাধ্যমে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ৫০ বছর ধরে সঞ্চালনের সক্ষমতা রয়েছে। ২০১৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সমুদ্র চ্যানেল দিয়ে সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ সংযোগের ১৪৪ কোটি টাকার প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন হয়। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে চীনা কোম্পানি জেডটিটি প্রকল্পটির কাজ পেলেও বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি চীনের এসবি সাবমেরিন সিস্টেমস কোম্পানি লিমিটেডের সহযোগিতা নিয়েছিল।
জানা গেছে, গতকাল সন্দ্বীপের বাউরিয়া ইউনিয়নের সন্দ্বীপ চ্যানেলের উপকূলে প্রায় ৪০ ফুট দৈর্ঘ্য পর্যন্ত দুটি কেবল দৃশ্যমান হওয়ায় সেটি রক্ষা এবং ওই এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে পাউবোকে চিঠি দেয় পিডিবি। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীকে দেয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ভাঙনের ফলে নিচ থেকে বের হয়ে আসা ৩৩ কেভির সাবমেরিন কেবল দুটি বর্তমানে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। কেবলটি বিপজ্জনক হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় শিশু-কিশোর এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও এ কেবল দুটির ওপর উঠে ছবি তোলাসহ আশপাশে ভিড় করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ছবি ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ ও সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে সমুদ্র চ্যানেলের খাড়া অংশে বাঁধ দিয়ে কেবলগুলো সুরক্ষার সুযোগ না থাকায় আপাতত ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ লেখা সাইনবোর্ড দিয়ে ওই এলাকায় মানুষের যাতায়াত বন্ধ রাখার পথে হাঁটছে পিডিবি ও স্থানীয় প্রশাসন।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সন্দ্বীপ চ্যানেল-তীরবর্তী এলাকায় ৩৩ কেভির দুটি বৈদ্যুতিক কেবল দৃশ্যমান হওয়ার খবর এবং পিডিবির চিঠি পাওয়ার পর পাউবোর প্রকৌশলীরা গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সন্দ্বীপ রক্ষার বেড়িবাঁধ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার বাইরে ভাঙনকবলিত এলাকায় কেবলগুলো দৃশ্যমান হওয়ায় সংস্থাটির পক্ষ থেকে কিছুই করার নেই বলে দাবি করা হয়েছে। প্রাকৃতিক সামুদ্রিক উপকূলে ভাঙন তৈরি হলে কেবলগুলোর যাতে ক্ষতি না হয়, এমন পদ্ধতি ও নিরাপত্তা দেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই বলে দাবি করেছেন পাউবো কর্মকর্তারা।
সাবমেরিন কেবলের দৃশ্যমান অংশ রক্ষায় পিডিবির চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী-২ (চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বিভাগ-২) ড. তানজির সাইফ আহমেদ বলেন, ‘পিডিবির চিঠি পেয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে আমাদের প্রকৌশলীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বেড়িবাঁধ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার চ্যানেলের ভেতরে ভাঙন এলাকায় বৈদ্যুতিক কেবল মাটির ভেতর থেকে বের হয়ে আসায় সেখানে কোনো কাজ করার সুযোগ নেই। ভাঙনকবলিত অংশে চ্যানেলের মধ্যে মাটি ভরাট কিংবা ব্লক দেয়ারও সুযোগ নেই। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের অপারগতার বিষয়টি পিডিবিকে জানিয়ে দেব।’
প্রকৌশল-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৩৩ হাজার ভোল্টেজের সঞ্চালন সক্ষমতার কেবল মাটির ওপর উঠে আসায় এর আস্তরণে লিকেজ তৈরির ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া কেবল চুরি করে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় তা পুরো সঞ্চালন লাইনের জন্য বিপজ্জনক। লিকেজ তৈরি হলে কেবলের সংস্পর্শে আসা যেকোনো প্রাণীর তাৎক্ষণিক মৃত্যু হতে পারে। উন্মুক্ত কেবলের ওপর নৌযানের নোঙর বা ধাতব কিছুর সঙ্গে লেগে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এতে সামুদ্রিক ওই অঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট এলাকার পানি বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়ার পাশপাশি সন্দ্বীপের সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নেয়া হলে সন্দ্বীপের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সংকটের মধ্যে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। এক্ষেত্রে কেবল স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা এ-সংক্রান্ত দক্ষ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের সাহায্য ছাড়া সন্দ্বীপের সাবমেরিন কেবলের সংকট এড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা।
জানতে চাইলে পিডিবি চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (বিতরণ) মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কাছে সাবমেরিন কেবলের সঞ্চালন লাইন সমুদ্র কিংবা সন্দ্বীপ চ্যানেল-তীরবর্তী এলাকায় দৃশ্যমান হয়ে যাওয়া একটি সম্পূর্ণ নতুন ঘটনা। ফলে এ বিষয়ে করণীয় কী আমরা এখনই নির্ধারণ করতে পারিনি। তবে দৃশ্যমান উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী কেবলগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা, স্থানীয়দের কেবলের সংস্পর্শে এলে সমূহ বিপদ থেকে সুরক্ষা দেয়াসহ দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পাউবোকে চিঠি দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, উপজেলা প্রশাসনকেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি চালু হওয়ার সাত-আট বছরের মধ্যেই সন্দ্বীপ চ্যানেলের তীরের ভাঙন ও বৈদ্যুতিক কেবল দৃশ্যমান হওয়ায় এটি সমাধানের কোনো প্রযুক্তি আপাতত জানে না বিদ্যুৎ বিভাগ। এক্ষেত্রে প্রকল্প নেয়ার সময় সম্ভাব্যতা যাচাই, সংকটকালে কীভাবে উত্তরণ সম্ভব, সে বিষয়ে গাফিলতি ছিল কিনা সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি। ভাঙন তীব্র হলে তীরবর্তী এলাকায় চলাচলকারী নৌযানের আঘাতে কেবল বিচ্ছিন্ন হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকিরও আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
জানা গেছে, সন্দ্বীপ চ্যানেলের তলদেশ দিয়ে সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে মোট ৪২ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক কেবল ব্যবহার করা হয়েছে। লাইনটি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড এলাকা থেকে সন্দ্বীপের বাউরিয়া এলাকায় সঞ্চালন করা হয়েছে। রোবটের মাধ্যমে জাহাজ থেকে কেবল দুটি চ্যানেলের তলদেশের ১০ ফুট মাটি খুঁড়ে বসানো হয়েছিল। তবে তীরবর্তী এলাকায় গিয়ে কেবল দুটির ভূগর্ভস্থ গভীরতা পাঁচ ফুটে নেমে আসে, যার কারণে বাউরিয়া ইউনিয়ন এলাকায় ভাঙন সৃষ্টি হলে বৈদ্যুতিক কেবল দুটি দৃশ্যমান হয়ে যায়। ভাঙন আররোও তীব্র হলে সাবমেরিন কেবল আরো বেশি দৃশ্যমান হবে, যা সন্দ্বীপের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পিডিবির প্রকৌশলীরা বলছেন, সাত-আট বছর আগে রোবটিক প্রযুক্তিতে বৈদ্যুতিক কেবল বসানো হয়েছিল। এখন দেশীয় প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ কেবল উন্মুক্ত হওয়ায় আপাতত কিছুই করার নেই। চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সাহায্য চাওয়া ছাড়া এ সংকট সমাধানের কোনো উপায় নেই বলে জানিয়েছেন তারা।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের আগে সন্দ্বীপে জেনারেটরের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয়া হতো। সন্ধ্যা ৬টা থেকে পৌর এলাকায় আড়াই হাজার গ্রাহককে রাত ১১টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ দেয়া হতো। প্রায় চার লাখ জনসংখ্যার দ্বীপটিতে বর্তমানে ৫৩ হাজার বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন ১১-১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে। পুরো দ্বীপকে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় নিয়ে এলে সন্দ্বীপে সর্বোচ্চ ৫০-৬০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিতরণের সক্ষমতা রয়েছে পিডিবির।
সূত্র : বণিক বার্তা


