সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের আর নেই
রবিবার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ইন্তিকাল করেছেন। আজ ভোর ৪টা ১৯ মিনিটে রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।
বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মৃত্যুকালে প্রবীণ এই রাজনীতিকের বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। মেয়ে নিলুফার জমির এবং দুই ছেলে নওশাদ জমির ও নওফেল জমিরসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি। বড় ছেলে নওশাদ জমির বর্তমানে পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য। জমির উদ্দিন সরকারের স্ত্রী নূর আখতার ২০২৩ সালে মারা যান।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বার্ধক্যজনিত ও বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতার কারণে বেশ কিছুদিন ধরে তিনি বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শনিবার (১১ জুলাই) রাতেই জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল হাসপাতালে তার শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া
বিএনপির এই প্রবীণ নেতার মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং আইন অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। সহকর্মীদের অনেকে শোক জানাতে তার ধানমন্ডির বাসায় যান।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মরহুমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে তার বিদাহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন।
এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খানও তাদের সহকর্মীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।
সাবেক এই স্পিকারের জানাজা ও দাফনের বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে পরবর্তী সময়ে জানানো হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশের একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর, তিনি ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৯তম অস্থায়ী (ভারপ্রাপ্ত) রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবন
ছাত্রজীবনে ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। পরে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি।
১৯৭১ সালে হাই কোর্টের আইনজীবীদের যে গ্রুপটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, জমির উদ্দিন সরকার তাদের অন্যতম।
জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল বা জাগদল গঠন করলে তাতে যোগ দেন জমির উদ্দিন সরকার। পরে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। আমৃত্যু তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।
জমির উদ্দিন সরকার ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
এরপর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে, ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ ও সপ্তম সংসদ নির্বাচনে এবং ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে নিজের পুরনো আসন পঞ্চগড়-১ থেকে সংসদে যান এই বিএনপি নেতা।
২০০৯ সালে বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনে জিতে নবম জাতীয় সংসদের সদস্য হন জমির উদ্দিন সরকার।
তিনি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আইন ও বিচার এবং শিক্ষামন্ত্রীসহ মোট ছয়বার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
বার্ধক্যেও তিনি সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী হিসেবে নিয়মিত আদালতে আইন পেশা পরিচালনা করেন।
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার নয়াবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স এবং মা বেগম ফখরুন্নেছা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করার পর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি করেন জমির উদ্দিন সরকার। পরে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-এট-ল সনদ পান।
দেশে ফিরে ১৯৬০ সালে আইন পেশায় যুক্ত হয়ে জমির উদ্দিন সরকার সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
বই রচনা
তার লেখা বইয়ের মধ্যে আছে ‘গণতন্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ’, ‘এক নজরে সংসদ সম্পর্কিত বিধিবিধান’, ‘লন্ডনে শিক্ষা জীবন’, ‘দি ল অব দি সি’, ‘লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন’, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ও ডিগবাজি’, ‘পল রাজ থেকে পলাশী এবং ব্রিটিশ রাজ থেকে বঙ্গভবন’, ‘ল অব দি ইন্টারন্যাশনাল রিভারস অ্যান্ড আদার ওয়াটারকোর্স’।


