ভোটের মাঠে অবৈধ অস্ত্রের ভয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সামনে ভোটের মাঠে এখনো অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি রয়েছে। নির্বাচনের বাকি রয়েছে আর মাত্র দুই দিন। দেশের সব নির্বাচনী এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের প্রচার এখন তুঙ্গে। একই সঙ্গে প্রার্থীদের সমর্থকরা নানাভাবে এলাকায় প্রভাব বিস্তারে তৎপর।
এতে বিরোধ থেকে প্রায়ই ঘটছে সংঘাত। ব্যবহৃত হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র। ঘটছে খুনাখুনির মতো ঘটনা।
এর মধ্যে সীমান্তপথে নানাভাবে অবৈধ অস্ত্রের আমদানির ঘটনা বাড়তি উত্তেজনা যোগ করেছে।
এসব ঘটনা অনেক ভোটারের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও ভীতি সৃষ্টি করেছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শনিবার থেকে সারা দেশে যৌথ বাহিনী আরো সক্রিয় হয়ে মাঠে নেমেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এখনো জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগের বড় কারণ অবৈধ অস্ত্র। থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া এসব আগ্নেয়াস্ত্র ভোটে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্রুত এসব অস্ত্র উদ্ধার করে ভোটারদের স্বস্তি ফেরানোর বিকল্প নেই।
নির্বাচন সামনে রেখে থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে তৎপরতা বাড়াতে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। এ নিয়ে পুলিশ দফায় দফায় বৈঠক করেছে। সর্বশেষ গত ২৯ ডিসেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরে মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় এ ব্যাপারে তিনি আরো কঠোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের এক হাজার ৩৩১টি আগ্নেয়াস্ত্র গত ১৭ মাসেও উদ্ধার হয়নি।
দুই হয়নি। দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪টি গুলি এখনো উদ্ধার করা যায়নি। পুলিশ বলছে, এর বেশির ভাগ চলে গেছে সন্ত্রাসীদের হাতে।
জুলাই গণ-আন্দোলনের সময় বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশি স্থাপনা থেকে পাঁচ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে গণভবন থেকে লুট হওয়া স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৩২টি ভয়ংকর অস্ত্রও রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানে বেশির ভাগ অস্ত্র উদ্ধার হলেও এক হাজার ৩৩১টি অস্ত্র এখানো উদ্ধার হয়নি।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, রাজধানীর পল্টনে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করে হত্যার পর থেকে দেশে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ শুরু হয়। এই বিশেষ অভিযানে এ পর্যন্ত ৭২৫টি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। তল্লাশিকালে ২৫ হাজার ৪১৯ রাউন্ড গুলি, এক হাজার ৭৫৪ রাউন্ড কার্তুজ, ৪৩৯টি ককটেল এবং ৮২টি বোমা উদ্ধার করা হয়। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় ২৫ হাজার ৭০২ জনকে।
গত শুক্রবার রাজধানীর মধ্য বাড্ডার বেপারিপাড়ায় একটি বাড়ি থেকে ১১টি অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্র, ৩৯৪টি গুলিসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের সহযোগী মেহেদী হাসান দিপুকে গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনী।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বাড্ডা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার আসাদুজ্জামান বলেন, গ্রেপ্তার মেহেদীর বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া অস্ত্রের উৎস জানার চেষ্টা চলছে। তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ, হাসপাতাল ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রে খুনাখুনির ঘটনা বেড়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত গত ১৩ মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় তিন শতাধিক বিভিন্ন মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়। নিহত হয়েছে শতাধিক।
গত শনিবার মুন্সীগঞ্জ সদর আসন ও গোপালগঞ্জ-২ আসনে সহিংসতার ঘটনায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হয়। মুন্সীগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের মুন্সীকান্দি এলাকায় নির্বাচনী প্রচারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে গুলির ঘটনায় তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়।
আগের দিন গত শুক্রবার নির্বাচনী প্রচার শেষে বাড়ি ফেরার পথে গোপালগঞ্জ-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সিপন ভূঁইয়ার ওপর দুর্বৃত্তদের গুলি ছোড়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার পর প্রার্থীসহ কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ভীতি ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে খুলনায় সেলুন থেকে টেনে বের করে রাকিব হোসেন নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ সময় শহরের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনকে ঘিরে সভা-সমাবেশ, চায়ের দোকানে আড্ডা আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিশেষ অভিযান চলছিল।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সারা দেশে সহিংসতায় দলীয় কোন্দল ও অন্তঃকোন্দলে পাঁচজন নিহত হয়েছে। বিভিন্ন দল এবং দলের মনোনীত প্রার্থী ও বঞ্চিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, ইশতেহার ঘোষণার প্রোগ্রামে বসা নিয়ে সংঘর্ষসহ বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় রাজনৈতিক দলের ৯৭০ জনের বেশি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনী সহিংসতার ১৬২টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তঃকোন্দলে ৪০টি ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ৩৩৪ জন এবং নিহত হয়েছে তিনজন। এ ছাড়া বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ৫০টি সংঘর্ষে আহত হয়েছে ৫৬০ জন এবং নিহত হয়েছে একজন, বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে দুটি সংঘর্ষে আহত হয়েছে দুজন, বিএনপি-এনসিপির মধ্যে আটটি সংঘর্ষে আহত হয়েছে ৩৯ জন এবং বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে আটটি সংঘর্ষে আহত হয়েছে ৩২ জন। বিভিন্ন দলের মধ্যে দুটি ঘটনায় আহত হয়েছে তিনজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তফসিল ঘোষণার পর থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত অন্তত ১২টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৮ জন নারী হেনস্তার শিকার হয়েছে এবং ছয়জন নারী আহত হয়েছে। হেনস্তার শিকার এসব নারীর মধ্যে ১৭ জন জামায়াত সমর্থক এবং একজন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমর্থক নারী রয়েছে। তবে ১২টি হেনস্তা ও হামলার ঘটনার মধ্যে ১১টি ঘটনায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং একটি ঘটনায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে দেশে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে। এসব অস্ত্র হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করার প্রমাণ রয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় কিশোর গ্যাংসহ অন্য সন্ত্রাসীদের হাতে এখন অনেক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সীমান্ত দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করছে। থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী তৎপর রয়েছে।
অবৈধ অস্ত্রে বাড়ছে খুনাখুনি : গত বছর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি শহীদ হওয়া ছাড়াও অর্ধশতাধিক ব্যক্তি রাজনৈতিক বিরোধের কারণে গুলিতে নিহত হন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ব্যস্ততম সড়কে আব্দুল হাকিম নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাসান মোল্লাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হাসান মোল্লার এই হত্যাকাণ্ডে ওই এলাকায় আসন্ন নির্বাচনের আগে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। কক্সবাজারের রামুতে গুলি করে হত্যা করা হয় এক যুবককে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার না হওয়া এসব অস্ত্র এখন সন্ত্রাসীদের হাতবদল হয়ে চলে গেছে চরমপন্থী, জঙ্গি ও জেল পালানো আসামিদের হাতে। গোয়েন্দাদের মতে, সীমান্তপথে ছোট ছোট আগ্নেয়াস্ত্রের অনুপ্রবেশ এই ঝুঁকিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের সূত্র মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের ২৭টি সীমান্তবর্তী জেলায় সক্রিয় রয়েছে প্রায় ৭০০ ‘লাইনম্যান’। এই লাইনম্যানদের মাধ্যমে দেশে ঢুকছে ছোট ও মাঝারি আগ্নেয়াস্ত্র। বিশেষ করে পিস্তল ও রিভলভারের মতো ছোট অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে, যা বহন করা সহজ এবং যে কাউকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো সহজতর।
সীমান্তে বিজিবির ৬৪ অস্ত্র উদ্ধার : বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র বলছে, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত থেকে সম্প্রতি ৬৪টি বিভিন্ন ধরনের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া চার হাজার রাউন্ডের বেশি গুলিসহ শতাধিক হাতবোমা, হ্যান্ড গ্রেনেডসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
গতকাল রবিবার বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম জানান, বিজিবি গত জানুয়ারি মাসে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ অন্যান্য স্থানে অভিযান চালিয়ে ১৪টি বিদেশি ও দেশি পিস্তল, একটি হ্যান্ড গ্রেনেড, ১৩টি ম্যাগাজিন, ১৮৫ রাউন্ড গোলাবারুদ, একটি মর্টার শেল, একটি ককটেল এবং ২৮টি অন্যান্য অস্ত্র উদ্ধার করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, নির্বাচনের আগে থানা থেকে লুট হওয়া এবং সীমান্ত পেরিয়ে আসা অনেক আগ্নেয়াস্ত্র এখন সন্ত্রাসীদের হাতে। এত দিন সন্ত্রাসীরা অস্ত্রগুলো মজুদ করে বসে ছিল, এগুলো এখন তারা কাজে লাগাচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ওপর ভরসা করলে হবে না, যেসব জনপ্রতিনিধি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাঁদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।
সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ


