সেনা হেফাজতে মোজাফফর
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। ইতোমধ্যে গা শিউরে ওঠার মতো তথ্য দিয়েছেন ৪৫ বছর পর গ্রেফতার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন। জিজ্ঞাসাবাদে এই খুনি বর্ণনা করছেন ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত। জিয়াউর রহমানকে প্রথম কে গুলি করেন, লাশ প্রথম কে বা কারা সরিয়েছিল, কীভাবে মরদেহ ট্রাকে বা অন্য কোথাও নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে ঘাতকরা কীভাবে, কার সাহায্যে পালিয়ে গিয়েছিল-সবকিছু হুবহু বিবরণ তিনি দিয়েছেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে আড়াল বা ‘হাইড আউট’ করার চেষ্টাও করেছেন। অনেক কিছুই তিনি স্বীকার করেছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, মোজাফফরের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো খুবই স্পর্শকাতর। এ কারণে এ মুহূর্তে বিষয়গুলো মিডিয়াকে জানানো যাচ্ছে না। মোজাফফর হোসেন এখন সেনাবাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন। তাকে একটি বিশেষ ইউনিটে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে মোজাফফরকে গ্রেফতারের পর হত্যাকাণ্ডে তার ভূমিকা এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত জানতে জনমনে তৈরি হয়েছে নানা কৌতূহল।
অপরাধ বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, মোজাফফরকে গ্রেফতারের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বড় অগ্রগতি হয়েছে। এই গ্রেফতারের ঘটনাটি দীর্ঘদিনের এক অজানা অধ্যায় ও রহস্যের জট খুলবে বলে তাদের ধারণা।
তারা বলছেন, মোজাফফর যেহেতু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত, তাই তার কাছে থেকে সব তথ্য বের করতে হবে। হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড কারা, দেশি-বিদেশি কোন কোন মহল এর সঙ্গে জড়িত-সবই তিনি জানেন। ফলে বিস্তারিত ও পূর্ণঙ্গ তথ্য বের করার আগে তার শাস্তি নিশ্চিত করা ঠিক হবে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সেনাবাহিনী থেকে তাকে আগেই পলাতক ঘোষণা করা হয়। যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানে তাকে গ্রেফতার করতে হবে-এটাই আইন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেই আইন প্রতিপালন করেছে। এখন তাকে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন করা যেতেই পারে। জিজ্ঞাসাবাদে ওই ঘটনায় তার অবস্থান এবং জড়িত অন্যদের বিষয়ে তথ্য উদঘাটন হতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই মেজর মোজাফফর পলাতক ছিলেন। তৎকালীন মেজর মঞ্জুরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসাবে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার কারণে সেনা আইনে তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি।
সেনা আইন অনুযায়ী, কোনো সদস্য পলাতক থাকলে তাকে ‘অ্যাবসকন্ড’ (পলাতক) হিসাবে ঘোষণা করা হয়। কোর্ট মার্শাল বা সামরিক আদালতে বিচার সম্পন্ন করতে হলে আসামির উপস্থিতি ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা বাধ্যতামূলক। এজন্য এতদিন তাকে পলাতক হিসাবেই তালিকাভুক্ত করে রাখা হয়েছিল।
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কুশীলব এবং মূল মাস্টারমাইন্ড কারা ছিলেন, তা এখনো একধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে রয়ে গেছে। এমতাবস্থায় মেজর (অব.) মোজাফফরকে গ্রেফতারের পর তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিস্তারিত তথ্য জানার আগেই তার যেন শাস্তি নিশ্চিত না হয়, সে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের গভীরভাবে ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, অনেকের মনেই সন্দেহ রয়েছে যে, এর পেছনে এরশাদ আমলের অনেকের যোগসাজশ থাকতে পারে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চট্টগ্রামের থানায় যে মামলা হয়েছিল, তার বর্তমান বিচারিক অবস্থা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে।


