বিটুমিন আমদানিতে মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক

সড়ক-মহাসড়ক তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিটুমিন আমদানিতে মান নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ ছিল না। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) মান যাচাই ছাড়াই অবাধে দেশে আমদানি হয়ে আসছিল ভেজাল ও নিম্নমানের বিটুমিন। এখন থেকে দেশে আমদানি হওয়া পেট্রোলিয়াম বিটুমিন পণ্য খালাসের আগে সরকার নির্ধারিত তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গুণগত মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন হাওলাদার স্বাক্ষরিত একটি আদেশ গত মঙ্গলবার জারি করা হয়। আদেশে উল্লেখ করা হয়, আমদানি ও রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইনে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে আমদানি নীতি আদেশ-২০১৫-২০১৮-এর এই সংশোধন করেছে সরকার।
ওই আদেশে বলা হয়, পেট্রোলিয়াম কোক ও পেট্রোলিয়াম বিটুমিন ছাড়া পেট্রোলিয়াম তেলের রেসিডিউসমূহসহ সব পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ; তবে পেট্রোলিয়াম বিটুমিন আমদানির ক্ষেত্রে এইচএস কোড নম্বর ২৭১৩.২০.১০ ও ২৭১৩.২০৯০-এর পণ্য খালাসের আগে এর গুণগত মান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড থেকে পরীক্ষা করাতে হবে।
মান যাচাই ছাড়া অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি করে ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সিন্ডিকেট নিম্নমানের বিটুমিন এনে তার সঙ্গে ভেজাল মিশিয়ে বিক্রি করছে। এর ফলে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের পরপরই তা অকার্যকর হয়ে পড়ছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরকারের গচ্চা যাচ্ছে শত শত কোটি টাকা। সড়কে স্বাচ্ছন্দ্যে চলার পরিবর্তে ভোগান্তিতে পড়ছে মানুষ।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ম-নীতি ও তদারকি না থাকায় নিম্নমানের বিটুমিন আসছে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে। আমদানিকারকদের সরকারের নির্ধারিত কোনো মান পরীক্ষার মুখেই পড়তে হয় না। তদারকি না থাকার এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেদার আমদানি করা হচ্ছে নিম্নমানের বিটুমিন। এর ফলে দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সড়ক নির্মাণের পর ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে বিটুমিন গলানো, পাথরের সঙ্গে বিটুমিনের মিশ্রণে যে নিয়ম-নীতি মানা প্রয়োজন, তা-ও ঠিকভাবে পালন না করায় সড়কগুলোর সর্বনাশ হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মান যাচাইয়ের উদ্যোগ নিল সরকার।
জানা গেছে, ২০১৫ সালে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার বন্ধে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে বলা হয়, রাস্তার কাজে ৬০ থেকে ৭০ গ্রেডের উন্নত মানের বিটুমিন ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় ঠিকাদাররা আমদানি করা নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার করছেন।
জানা গেছে, দেশে বর্তমানে বিটুমিনের বার্ষিক চাহিদা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন। দেশে বিটুমিনের বাজার প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার। সেখানে উপজাত হিসেবে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন বিটুমিন সরবরাহ করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। এটি মোট চাহিদার ১৩ শতাংশেরও কম। বাকি বিটুমিনের জন্য দ্বারস্থ হতে হয় আমদানিকারকদের।
এদিকে সঠিক মান নির্দিষ্টকরণের লক্ষ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই বিটুমিন ব্যবহারের সুপারিশ করেছে বিটুমিনের গ্রেড নির্ধারণ কমিটি।
জানা গেছে, বিটুমিনের মান নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাকারিয়াকে সভাপতি করে একটি ‘বিটুমিনের গ্রেড নির্ধারণ কমিটি’ গঠন করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। কমিটি গত বছর ৯ মার্চ বিটুমিনের গ্রেড নির্ধারণের লক্ষ্যে সভা করেছে। ওই সভার কার্যবিবরণীতে চারটি সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে বলা হয় : ১. বুয়েট কর্তৃক স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের জন্য তৈরি হওয়া রোড ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে সড়ক উন্নয়ন ও মেরামত করা। ২. ট্যারিফ ভলিউম বিবেচনায় এলজিইডির সড়কে ৬০ থেকে ৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার করা। ৩. ট্যারিফ ভলিউমের ওপর ভিত্তি করে বিশেষ ক্ষেত্রে জাতীয় মহাসড়ক বা ন্যাশনাল হাইওয়ে, আঞ্চলিক মহাসড়ক বা রিজিওনাল হাইওয়ে, বিমানবন্দর সড়ক, উপজেলা সড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কের জন্য ‘রোড ডিজাইন ও মিক্স ডিজাইন নিশ্চত করে পারফরম্যান্স গ্রেড বিটুমিন ও পলিমার মোডিফাইড বিটুমিন ব্যবহার করা। ৪. বিটুমিনের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক, মান নিয়ন্ত্রণকারী ও ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।
এ বিষয়ে সরকার গঠিত ‘বিটুমিনের গ্রেড নির্ধারণ কমিটি’র সভাপতি ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের সাবেক ডিন ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) বিটুমিন তৈরি করে এবং বিদেশ থেকেও কিছু বিটুমিন আমদানি হয়। যে বিটুমিনই আসুক না কেন, যথাযথ মান পরীক্ষায় যদি উত্তীর্ণ না হয়, তবে তা বাতিল করে দেবে কর্তৃপক্ষ। কারণ বিটুমিনের মান খারাপ হলেই রাস্তার ওপরের অংশ নষ্ট হয়ে যায়। বিটুমিন আমদানির পর নিয়মিত পরীক্ষা না হলে কোনো অবস্থাতেই সড়ক টিকবে না।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত মানের ৬০ থেকে ৭০ গ্রেডের বিটুমিন দিয়ে রাস্তায় পিচ ঢালাই দিলে সেই রাস্তা দু-তিন বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। অথচ আমাদের দেশের রাস্তাগুলো এক বছরও টেকে না। প্রতিবছর বর্ষার পরপরই দেশের প্রায় সব সড়ক ও মহাসড়ক সংস্কার করতে হয়। আবার পিচ ঢালাইয়ের পর ছয় মাসও সড়ক টেকে না—এমন নজিরও আছে দেশে। এর প্রধান কারণ আমদানি করা অতি নিম্নমানের বিটুমিন। এই বিটুমিন একদিকে অল্প তাপে গলে যায়, অন্যদিকে বর্ষার পানিতেও আঠা নষ্ট হয়ে যায়।